ইউক্রেনের সঙ্গে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসান নিয়ে শনিবার রাতে ক্রেমলিনে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
বৈঠকে অংশ নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও ব্যবসায়িক সহযোগী স্টিভ উইটকফ। রোববার প্রথমবারের মতো তারা ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ সফর করবেন।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে কুশনার ও উইটকফ একটি ‘প্রস্তাব’ নিয়ে যাচ্ছেন।
মস্কোর স্থানীয় সময় রাত ১১টার পর তিন ঘণ্টার কিছু বেশি সময় ধরে চলা বৈঠকটি শেষ হয়।
রোববার মার্কিন প্রতিনিধিদের ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে যাওয়ার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ এই সংঘাতের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আলোচনা আবারও শুরু করার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
আলোচনা নির্বিঘ্নে চালাতে রাশিয়া ও ইউক্রেন— দুই দেশই তিন দিনের জন্য একে অপরের রাজধানীতে হামলা না চালাতে সম্মত হয়েছে।
রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরুর আগে টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে পুতিন যুদ্ধ বন্ধে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান।
২০২২ সালে রাশিয়া এই যুদ্ধ শুরু করলেও যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি ‘সহজ নয়’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পুতিন বারবার বলেছেন, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের বাকি এলাকাও দখলে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে মস্কোর। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ইউক্রেনকে ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে কি না, সে বিষয়ে ওয়াশিংটন কিছু জানায়নি।
গ্রীষ্মজুড়ে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার পর মার্কিন প্রতিনিধিরা মস্কো সফর করলেন। এ সময়ে দুই দেশেই বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ব্যাপকভাবে বেড়েছে। যুদ্ধে এ পর্যন্ত কয়েক লাখ মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
ইউক্রেন শনিবার জানিয়েছে, সেদিন রাশিয়ার হামলায় দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ১০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে খারকিভ অঞ্চলের একটি শিশু ও তার পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। কিয়েভের বাইরে আরও দুজন নিহত হয়েছেন।
কিয়েভে মার্কিন প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন পুতিন। যুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই মস্কো কিয়েভে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে।
উইটকফ ও কুশনারকে পুতিন বলেন, ‘আলোচনা প্রক্রিয়া এবং আপনাদের মতো মধ্যস্থতাকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের পক্ষ থেকে যা যা করা সম্ভব, আমরা সবই করব।’
এর এক দিন আগে কিয়েভ জানিয়েছিল, মস্কো শহরের কেন্দ্রে তাদের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউর সদর দপ্তরে হামলা চালিয়েছে।
আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে মস্কো ও কিয়েভ— দুই পক্ষই একে অপরের শহরে হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘রুশ প্রেসিডেন্ট ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক মধ্যরাত থেকে তিন দিনের জন্য কিয়েভে হামলা না চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।’
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও পরে জানান, তিনি মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং কিয়েভও মস্কোতে হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেলেনস্কি বলেন, ‘শনিবার, রোববার ও সোমবার— এই তিন দিন ইউক্রেন মস্কোতে হামলা থেকে বিরত থাকতে প্রস্তুত।’
শনিবার পুতিন বলেন, তিনি লক্ষ্য করেছেন যে ইউক্রেন রাশিয়া ও মস্কোর ওপর হামলা ব্যাপকভাবে কমিয়েছে।
মার্কিন দুই প্রতিনিধি কিয়েভে যাচ্ছেন বলেও তাকে জানানো হয়েছে বলে জানান পুতিন।
পুতিন বলেন, ‘যাই ঘটুক না কেন, এ ধরনের যোগাযোগ নিঃসন্দেহে সবসময়ই উপকারী।’
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রোববার কিয়েভে মার্কিন প্রতিনিধিদের তিনি স্বাগত জানাবেন।
তবে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ এখনো কোনো বড় অগ্রগতি আনতে পারেনি। কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানি এবং লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতির পরও শান্তি আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার মধ্যে আংশিকভাবে ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যুদ্ধের কারণেও মস্কো ও কিয়েভ দূরপাল্লার হামলা আরও বাড়িয়েছে।
মার্কিন প্রতিনিধিরা যখন ক্রেমলিনে বৈঠক করছিলেন, তখন ইউক্রেন জানায়, রাশিয়ার হামলায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভের চুহুইভ শহরে একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন।
আঞ্চলিক নেতা ওলেগ সিনেগুবভ বলেন, ‘এই গোলাবর্ষণে প্রায় পুরো পরিবারটিই নিহত হয়েছে— ১৯ বছরের এক তরুণী, ১১ বছরের এক বালক ও ৪৫ বছর বয়সী এক পুরুষ ব্যক্তি নিহত হয়েছে।
এর আগে শনিবার রাশিয়া কিয়েভের উপকণ্ঠ ও দনিপ্রো অঞ্চলে হামলা চালায়।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, এসব হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, বেসামরিক স্থাপনার পাশাপাশি কিয়েভের দুটি বিমানবন্দরে রাতভর হামলা চালিয়ে মস্কো মার্কিন প্রতিনিধিদের সফর বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।
ট্রাম্প গত বছর আবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এরপর উইটকফ ও কুশনারের এটাই প্রথম কিয়েভ সফর হতে যাচ্ছে।